সরকারি পদ আর বিক্রির পণ্য নয়, চাই স্বচ্ছ পদায়নব্যবস্থা
অনলাইন ডেস্ক
২৪-১০-২০২৬ দুপুর ৪:৪
সরকারি পদ আর বিক্রির পণ্য নয়, চাই স্বচ্ছ পদায়নব্যবস্থা
সরকারি চাকরিতে কে কোথায় নিয়োগ পাবেন, কোন কর্মকর্তা কোন পদে পদায়িত হবেন কিংবা কার ভাগ্যে জুটবে লাভজনক কর্মস্থল—এসব সিদ্ধান্ত যদি যোগ্যতা ও প্রাতিষ্ঠানিক নিয়মের পরিবর্তে অর্থের বিনিময়ে নির্ধারিত হয়, তাহলে প্রশাসনে সুশাসন প্রতিষ্ঠা করা কঠিন। বাংলাদেশের সরকারি দপ্তরগুলোতে দীর্ঘদিন ধরে নিয়োগ, বদলি ও পদোন্নতিকে কেন্দ্র করে যে তদবিরনির্ভর বাণিজ্য গড়ে উঠেছে, তা দুর্নীতির অন্যতম প্রধান উৎস। এই ব্যবস্থার সঙ্গে জড়িত একটি প্রভাবশালী মধ্যস্বত্বভোগী চক্র রাজনৈতিক ক্ষমতার পালাবদলের সঙ্গে নিজেদের পরিচয় বদলে প্রশাসনের ভেতরে সক্রিয় থাকে। সরকার বদলায়, ক্ষমতাসীন দলের নাম বদলায়, কিন্তু সুবিধাভোগী এই চক্রের তৎপরতা থামে না। শেষ পর্যন্ত তাদের কর্মকাণ্ডের দায় এসে পড়ে সরকারের ওপর, আর ক্ষতিগ্রস্ত হয় প্রশাসনের স্বচ্ছতা ও জনগণের অধিকার।
এই দুর্নীতির সবচেয়ে বিপজ্জনক দিক হলো, অর্থের বিনিময়ে কাঙ্ক্ষিত পদে বসার পর অনেক কর্মকর্তা-কর্মচারীর কাছে জনসেবা নয়, বিনিয়োগ করা অর্থ তুলে আনাই প্রধান লক্ষ্য হয়ে দাঁড়ায়। যে ব্যক্তি লাখ লাখ কিংবা কোটি টাকা খরচ করে একটি লাভজনক পদে নিয়োগ বা বদলি হন, তিনি সেই অর্থ বৈধ উপায়ে ফেরত পাওয়ার সুযোগ সীমিত দেখলে অনিয়ম ও ঘুষের আশ্রয় নিতে পারেন। এভাবেই ঘুষ দিয়ে পদ পাওয়া, পদে বসে ঘুষ আদায় এবং সেই অর্থের একটি অংশ ঊর্ধ্বতন পর্যায়ে পৌঁছে দেওয়ার চক্র তৈরি হয়। এর ফলে জবাবদিহি দুর্বল হয়, সৎ কর্মকর্তারা নিরুৎসাহিত হন এবং সাধারণ মানুষ সরকারি সেবা পেতে গিয়ে হয়রানি ও আর্থিক ক্ষতির শিকার হন।
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন বিএনপি সরকার দায়িত্ব গ্রহণের পর দুর্নীতি প্রতিরোধে কঠোর অবস্থানের কথা ঘোষণা করেছে। প্রধানমন্ত্রীর ঘোষিত দুর্নীতির বিরুদ্ধে শূন্য সহনশীলতার নীতি বাস্তবায়নে সরকারি ব্যয় নিয়ন্ত্রণ, অপচয় রোধ এবং প্রশাসনিক কার্যক্রমে স্বচ্ছতা প্রতিষ্ঠার পাশাপাশি বদলি ও পদায়ন বাণিজ্য বন্ধ করাও গুরুত্বপূর্ণ। এ ক্ষেত্রে সরকারি পদে পদায়নের জন্য লটারি পদ্ধতি চালু করার উদ্যোগ বিশেষভাবে তাৎপর্যপূর্ণ। কারণ, কোনো পদে নিয়োগ বা বদলির সিদ্ধান্ত যদি ব্যক্তিগত তদবির, রাজনৈতিক প্রভাব কিংবা আর্থিক লেনদেনের পরিবর্তে নির্ধারিত যোগ্যতার ভিত্তিতে স্বচ্ছ প্রক্রিয়ায় নেওয়া যায়, তাহলে দুর্নীতির একটি বড় পথ বন্ধ করা সম্ভব।
সম্প্রতি সাব-রেজিস্ট্রারদের বদলিতে লটারি পদ্ধতি চালু করার উদ্যোগ এ ক্ষেত্রে আলোচনার দাবি রাখে। আইন মন্ত্রণালয়ের উদ্যোগে বদলি প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা নিশ্চিত করার লক্ষ্যে এ পদ্ধতি অনুসরণ করা হয়েছে। দীর্ঘদিন ধরে সাব-রেজিস্ট্রার পদকে কেন্দ্র করে ঘুষ ও তদবির বাণিজ্যের অভিযোগ রয়েছে। ফলে এ পদে বদলির ক্ষেত্রে লটারি চালুর উদ্যোগ প্রশাসনিক সংস্কারের একটি গুরুত্বপূর্ণ দৃষ্টান্ত হতে পারে। তবে এ ব্যবস্থায় দুর্নীতি কতটা কমেছে, তা নিশ্চিতভাবে মূল্যায়নের জন্য নিয়মিত নজরদারি, অভিযোগের পরিসংখ্যান এবং সেবাগ্রহীতাদের অভিজ্ঞতা পর্যালোচনা করা প্রয়োজন।
অতীতে ভূমি নিবন্ধন খাতের কিছু পদকে ঘিরে বিপুল অর্থের লেনদেনের অভিযোগ বিভিন্ন সময়ে আলোচনায় এসেছে। বিশেষ করে গুলশান, গাজীপুর, রূপগঞ্জ ও কেরানীগঞ্জের মতো গুরুত্বপূর্ণ এলাকায় সাব-রেজিস্ট্রার হিসেবে পদায়নের জন্য কোটি কোটি টাকা ব্যয়ের অভিযোগ রয়েছে। এসব অভিযোগের সত্যতা যথাযথ তদন্তের মাধ্যমে নির্ধারণ করা জরুরি। তবে একটি বিষয় স্পষ্ট—কোনো সরকারি পদকে যদি আর্থিক সুবিধা অর্জনের মাধ্যম হিসেবে বিবেচনা করা হয়, তাহলে সেখানে অনিয়মের ঝুঁকি বেড়ে যায়। লটারি পদ্ধতি সেই ঝুঁকি কমানোর একটি উপায় হতে পারে, যদি প্রক্রিয়াটি স্বচ্ছ, নিরপেক্ষ ও কারসাজিমুক্ত থাকে।
কিন্তু সাব-রেজিস্ট্রারদের বদলিতে লটারি চালু করলেই সরকারি প্রশাসনের বদলি বাণিজ্য বন্ধ হয়ে যাবে না। কারণ, দেশের বিভিন্ন সরকারি দপ্তরে এখনো লাভজনক পদে পদায়ন ও পছন্দের কর্মস্থলে বদলিকে কেন্দ্র করে তদবিরের অভিযোগ রয়েছে। সরকারি ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক থেকে শুরু করে চিকিৎসক, পুলিশ কর্মকর্তা, প্রকৌশলী, প্রশাসনিক কর্মকর্তা এবং বিভিন্ন স্তরের কর্মচারীদের পদায়ন নিয়ে নানা সময়ে প্রশ্ন উঠেছে। কিছু পদ ও কর্মস্থলকে ঘিরে এমন ধারণাও তৈরি হয়েছে যে, সেখানে নিয়োগ বা বদলি পেতে হলে অর্থ ব্যয় কিংবা প্রভাবশালী ব্যক্তির সুপারিশ প্রয়োজন।
আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর ক্ষেত্রেও বদলি বাণিজ্যের অভিযোগ দীর্ঘদিনের। বিশেষ করে থানাকেন্দ্রিক প্রশাসনে ওসির পদায়ন নিয়ে বিভিন্ন সময়ে অর্থ লেনদেনের অভিযোগ প্রকাশিত হয়েছে। গুলশান, বনানী ও ধানমন্ডির মতো অভিজাত এলাকার থানায় ওসি পদে যেতে অতীতে বিপুল অঙ্কের অর্থ ব্যয়ের অভিযোগও রয়েছে। একইভাবে কিছু থানায় কনস্টেবলসহ বিভিন্ন পদে নিয়োগ ও পদায়ন নিয়ে আর্থিক লেনদেনের অভিযোগ শোনা যায়। এসব অভিযোগের নিরপেক্ষ তদন্ত ও দায়ীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণ জরুরি।
যে পুলিশ সদস্যকে একটি পদে বসতে ঘুষ দিতে হয়, তাঁর ওপর সততা বজায় রাখার চাপ তৈরি করা কঠিন হয়ে পড়ে। কারণ, পদ পাওয়ার জন্য ব্যয় করা অর্থ ফেরত আনার প্রবণতা তাঁকে অনৈতিক পথে ঠেলে দিতে পারে। এভাবে বদলি বাণিজ্য শুধু প্রশাসনিক অনিয়ম সৃষ্টি করে না, আইনশৃঙ্খলা রক্ষা ও জনগণের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার ক্ষেত্রেও নেতিবাচক প্রভাব ফেলে।
নিম্ন আদালতের বিচারকদের বদলি ও পদায়ন নিয়েও বিভিন্ন সময়ে অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে। অতীতের বিভিন্ন প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত এবং বিচারকদের বদলি ঘিরে আর্থিক লেনদেনের অভিযোগের নিরপেক্ষ তদন্ত হওয়া প্রয়োজন। বিশেষ করে ঢাকা ও আশপাশের এলাকায় পদায়নকে কেন্দ্র করে তদবিরের অভিযোগ সামনে এসেছে। বিচার বিভাগের মতো গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠানে পদায়ন প্রক্রিয়া নিয়ে প্রশ্ন উঠলে বিচারব্যবস্থার নিরপেক্ষতা ও প্রাতিষ্ঠানিক আস্থাও ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। তাই এখানে স্বচ্ছ নীতিমালা, নির্ধারিত যোগ্যতা এবং জবাবদিহি নিশ্চিত করা অত্যন্ত জরুরি।
অন্তর্বর্তী সরকারের সময়েও সচিব পর্যায়ে পদায়ন ও পদোন্নতি, জেলা প্রশাসক নিয়োগ এবং জনপ্রশাসনের বিভিন্ন সিদ্ধান্ত নিয়ে অনিয়মের অভিযোগ গণমাধ্যমে প্রকাশিত হয়েছে। ডিসি নিয়োগ নিয়ে বিতর্কের জেরে জনপ্রশাসন সচিবের বদলির ঘটনাও আলোচনায় আসে। একই সময়ে রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংক ও বিমা প্রতিষ্ঠানের শীর্ষ পদে নিয়োগ ঘিরে মধ্যস্বত্বভোগীদের তৎপরতা এবং আর্থিক লেনদেনের অভিযোগও সামনে এসেছে। এসব ক্ষেত্রে অভিযোগের সত্যতা যাচাই করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার পাশাপাশি ভবিষ্যতে যাতে একই ধরনের পরিস্থিতি তৈরি না হয়, সে জন্য প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার জরুরি।
বন বিভাগ, গণপূর্ত অধিদপ্তর, সড়ক ও জনপথ অধিদপ্তর এবং স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তরের মতো উন্নয়ন ও অবকাঠামোসংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানেও লাভজনক পদে পদায়ন নিয়ে বিভিন্ন সময়ে অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে। এসব দপ্তরে প্রকল্প, ক্রয়, ঠিকাদারি ও প্রশাসনিক সিদ্ধান্তের সঙ্গে পদায়নের সম্পর্ক তৈরি হলে দুর্নীতির ঝুঁকি আরও বাড়ে। কোনো কোনো উচ্চপদে পদায়নের জন্য বিপুল অর্থ লেনদেনের অভিযোগও রয়েছে। তবে এ ধরনের গুরুতর অভিযোগের ক্ষেত্রে নির্দিষ্ট তথ্য, তদন্ত ও প্রমাণের ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত নেওয়া উচিত।
চিকিৎসকদের বদলি ও পদায়নের ক্ষেত্রেও একই সমস্যা দেখা যায়। ঢাকাকেন্দ্রিক সুযোগ-সুবিধা, পেশাগত উন্নয়ন এবং ব্যক্তিগত নানা কারণে অনেক চিকিৎসক রাজধানী ও আশপাশের এলাকায় কর্মস্থল পেতে আগ্রহী থাকেন। এ সুযোগে বদলি নিয়ে তদবির ও অর্থ লেনদেনের অভিযোগ ওঠে। অতীতে বিপুলসংখ্যক চিকিৎসক ও স্বাস্থ্যকর্মীর বদলি নিয়ে বিতর্কও হয়েছে। কোনো কোনো ক্ষেত্রে বদলির পর নতুন কর্মস্থলে যোগদান না করার অভিযোগ সামনে এসেছে। এর পরিণতিতে জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে চিকিৎসকসংকট আরও প্রকট হয় এবং প্রত্যন্ত অঞ্চলের মানুষ প্রয়োজনীয় স্বাস্থ্যসেবা থেকে বঞ্চিত হন।
সরকারি চাকরির পদায়ন ও বদলিতে দুর্নীতি চলতে থাকলে এর ক্ষতি কেবল সংশ্লিষ্ট দপ্তরের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না। একটি অসাধু মধ্যস্বত্বভোগী গোষ্ঠী প্রশাসনের বিভিন্ন স্তরে প্রভাব বিস্তার করে। তারা রাজনৈতিক পরিচয় ও ক্ষমতার নৈকট্য ব্যবহার করে নিজেদের অবস্থান শক্তিশালী করে। অন্যদিকে, যোগ্য ও সৎ কর্মকর্তারা পছন্দের কর্মস্থল কিংবা পদোন্নতির সুযোগ থেকে বঞ্চিত হতে পারেন। প্রশাসনের প্রতি জনগণের আস্থা কমে যায় এবং সরকারি সেবার মান ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
এ অবস্থায় সাব-রেজিস্ট্রারদের বদলিতে লটারি পদ্ধতি চালুর উদ্যোগকে বৃহত্তর প্রশাসনিক সংস্কারের সূচনা হিসেবে বিবেচনা করা যেতে পারে। তবে এ পদ্ধতির সফলতা নির্ভর করবে এর বাস্তবায়ন কতটা স্বচ্ছ ও কার্যকর হচ্ছে তার ওপর। লটারিতে অংশগ্রহণের আগে যোগ্যতা, অভিজ্ঞতা, চাকরির মেয়াদ, শৃঙ্খলাজনিত রেকর্ড এবং সংশ্লিষ্ট পদের উপযোগিতা যাচাই করতে হবে। এরপর নির্ধারিত যোগ্যতাসম্পন্ন কর্মকর্তাদের মধ্যে স্বচ্ছ ও নিরীক্ষাযোগ্য প্রক্রিয়ায় পদায়ন করা যেতে পারে। একই সঙ্গে বিশেষ পরিস্থিতিতে লটারির বাইরে পদায়নের প্রয়োজন হলে তার কারণ লিখিতভাবে প্রকাশ এবং স্বাধীনভাবে যাচাইয়ের ব্যবস্থা থাকা উচিত।
ইতোমধ্যে গণপূর্ত অধিদপ্তরের নির্বাহী প্রকৌশলীদের বদলি ও পদায়নে লটারি পদ্ধতি অনুসরণের উদ্যোগের কথা জানানো হয়েছে। বদলি বাণিজ্য বন্ধ, স্বচ্ছতা প্রতিষ্ঠা এবং জবাবদিহি নিশ্চিত করার লক্ষ্যে এ ধরনের উদ্যোগ অন্যান্য দপ্তরেও সম্প্রসারণ করা যেতে পারে। তবে শুধু লটারি চালু করলেই সব সমস্যার সমাধান হবে না। পদায়নের পর কর্মকর্তাদের কাজের মূল্যায়ন, অনিয়মের অভিযোগ তদন্ত, সম্পদের হিসাব যাচাই এবং সেবার মান পর্যবেক্ষণের ব্যবস্থাও জোরদার করতে হবে।
রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংক ও বিমা প্রতিষ্ঠানের ব্যবস্থাপনা পরিচালকসহ শীর্ষ নির্বাহী পদে নিয়োগের ক্ষেত্রেও স্বচ্ছ পদ্ধতি গ্রহণ করা সম্ভব। প্রথমে অভিজ্ঞতা, পেশাগত দক্ষতা, সততা ও কর্মদক্ষতার ভিত্তিতে যোগ্য প্রার্থীদের একটি তালিকা তৈরি করা যেতে পারে। এরপর যেসব পদে যোগ্য প্রার্থীদের মধ্যে সমান সুযোগ দেওয়া যুক্তিসংগত, সেখানে লটারি পদ্ধতি বিবেচনা করা যেতে পারে। তবে বিশেষায়িত ও নীতিনির্ধারণী পদে শুধু লটারির ওপর নির্ভর না করে যোগ্যতা যাচাই, নিরপেক্ষ বাছাই এবং প্রাতিষ্ঠানিক প্রয়োজনকে অগ্রাধিকার দিতে হবে।
জেলা প্রশাসক নিয়োগের ক্ষেত্রেও একটি স্বচ্ছ ও গ্রহণযোগ্য কাঠামো গড়ে তোলা সম্ভব। নির্ধারিত যোগ্যতা, অভিজ্ঞতা ও কর্মদক্ষতার ভিত্তিতে উপযুক্ত কর্মকর্তাদের তালিকা তৈরি করে পদায়নের সিদ্ধান্ত নেওয়া যেতে পারে। একইভাবে থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা, চিকিৎসক, প্রকৌশলী এবং অন্যান্য সরকারি কর্মচারীদের বদলির ক্ষেত্রে স্পষ্ট নীতিমালা অনুসরণ করা জরুরি। যেখানে একাধিক সমযোগ্য কর্মকর্তার মধ্যে কর্মস্থল বণ্টন করা প্রয়োজন, সেখানে লটারি কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারে। তবে কোনো পদ্ধতিই যেন পেশাগত যোগ্যতা, বিশেষায়িত দক্ষতা ও জনস্বার্থের প্রয়োজনকে উপেক্ষা না করে।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, বদলি ও পদায়নকে আর্থিক সুবিধা অর্জনের সুযোগ হিসেবে দেখার সংস্কৃতি বন্ধ করা। একজন কর্মকর্তা যদি কোনো পদে নিয়োগ বা বদলি পেতে ঘুষ দিতে বাধ্য না হন, তাহলে তাঁর ওপর সেই অর্থ তুলে আনার চাপও কমবে। এতে সততার সঙ্গে দায়িত্ব পালনের পরিবেশ তৈরি হতে পারে। পাশাপাশি সরকারি কর্মচারীদের জবাবদিহি নিশ্চিত করা গেলে জনগণের আস্থা অর্জন এবং সেবার মান উন্নয়নের সুযোগ বাড়বে।
দুর্নীতির বিরুদ্ধে কার্যকর লড়াই করতে হলে কেবল দুর্নীতির অভিযোগে ব্যক্তিবিশেষের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিলেই চলবে না; দুর্নীতি সৃষ্টির প্রাতিষ্ঠানিক পথগুলোও বন্ধ করতে হবে। নিয়োগ, বদলি ও পদায়ন বাণিজ্য এমনই একটি পথ, যা প্রশাসনের ভেতরে দুর্নীতির শিকড় বিস্তারে ভূমিকা রাখে। তাই এ ক্ষেত্রে স্বচ্ছতা প্রতিষ্ঠা করা বর্তমান সরকারের জন্য গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষাও বটে।
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সরকারের দুর্নীতিবিরোধী উদ্যোগ সফল করতে হলে সাব-রেজিস্ট্রারদের বদলিতে চালু হওয়া লটারি পদ্ধতির অভিজ্ঞতা মূল্যায়ন করে অন্যান্য উপযুক্ত সরকারি দপ্তরে তা পর্যায়ক্রমে সম্প্রসারণ করা যেতে পারে। একই সঙ্গে মধ্যস্বত্বভোগীদের তৎপরতা বন্ধ, বদলি ও পদায়নের নীতিমালা প্রকাশ, অভিযোগ তদন্ত এবং দায়ীদের শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে।
সরকারি চাকরিতে পদ পাওয়ার যোগ্যতা হবে দক্ষতা, অভিজ্ঞতা ও সততা—অর্থ কিংবা রাজনৈতিক তদবির নয়। এই নীতি প্রতিষ্ঠা করা গেলে প্রশাসনে দুর্নীতি কমানোর পাশাপাশি জনগণের সেবা নিশ্চিত করার পথও সুগম হবে। বদলি ও পদায়নে লটারি তাই সবার জন্য একক সমাধান না হলেও, যথাযথ যোগ্যতা যাচাই ও জবাবদিহির সঙ্গে বাস্তবায়িত হলে এটি দুর্নীতিবিরোধী সংস্কারের একটি কার্যকর হাতিয়ার হয়ে উঠতে পারে।
অনলাইন ডেস্ক
২৪-১০-২০২৬ দুপুর ৪:৪
সরকারি চাকরিতে কে কোথায় নিয়োগ পাবেন, কোন কর্মকর্তা কোন পদে পদায়িত হবেন কিংবা কার ভাগ্যে জুটবে লাভজনক কর্মস্থল—এসব সিদ্ধান্ত যদি যোগ্যতা ও প্রাতিষ্ঠানিক নিয়মের পরিবর্তে অর্থের বিনিময়ে নির্ধারিত হয়, তাহলে প্রশাসনে সুশাসন প্রতিষ্ঠা করা কঠিন। বাংলাদেশের সরকারি দপ্তরগুলোতে দীর্ঘদিন ধরে নিয়োগ, বদলি ও পদোন্নতিকে কেন্দ্র করে যে তদবিরনির্ভর বাণিজ্য গড়ে উঠেছে, তা দুর্নীতির অন্যতম প্রধান উৎস। এই ব্যবস্থার সঙ্গে জড়িত একটি প্রভাবশালী মধ্যস্বত্বভোগী চক্র রাজনৈতিক ক্ষমতার পালাবদলের সঙ্গে নিজেদের পরিচয় বদলে প্রশাসনের ভেতরে সক্রিয় থাকে। সরকার বদলায়, ক্ষমতাসীন দলের নাম বদলায়, কিন্তু সুবিধাভোগী এই চক্রের তৎপরতা থামে না। শেষ পর্যন্ত তাদের কর্মকাণ্ডের দায় এসে পড়ে সরকারের ওপর, আর ক্ষতিগ্রস্ত হয় প্রশাসনের স্বচ্ছতা ও জনগণের অধিকার।
এই দুর্নীতির সবচেয়ে বিপজ্জনক দিক হলো, অর্থের বিনিময়ে কাঙ্ক্ষিত পদে বসার পর অনেক কর্মকর্তা-কর্মচারীর কাছে জনসেবা নয়, বিনিয়োগ করা অর্থ তুলে আনাই প্রধান লক্ষ্য হয়ে দাঁড়ায়। যে ব্যক্তি লাখ লাখ কিংবা কোটি টাকা খরচ করে একটি লাভজনক পদে নিয়োগ বা বদলি হন, তিনি সেই অর্থ বৈধ উপায়ে ফেরত পাওয়ার সুযোগ সীমিত দেখলে অনিয়ম ও ঘুষের আশ্রয় নিতে পারেন। এভাবেই ঘুষ দিয়ে পদ পাওয়া, পদে বসে ঘুষ আদায় এবং সেই অর্থের একটি অংশ ঊর্ধ্বতন পর্যায়ে পৌঁছে দেওয়ার চক্র তৈরি হয়। এর ফলে জবাবদিহি দুর্বল হয়, সৎ কর্মকর্তারা নিরুৎসাহিত হন এবং সাধারণ মানুষ সরকারি সেবা পেতে গিয়ে হয়রানি ও আর্থিক ক্ষতির শিকার হন।
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন বিএনপি সরকার দায়িত্ব গ্রহণের পর দুর্নীতি প্রতিরোধে কঠোর অবস্থানের কথা ঘোষণা করেছে। প্রধানমন্ত্রীর ঘোষিত দুর্নীতির বিরুদ্ধে শূন্য সহনশীলতার নীতি বাস্তবায়নে সরকারি ব্যয় নিয়ন্ত্রণ, অপচয় রোধ এবং প্রশাসনিক কার্যক্রমে স্বচ্ছতা প্রতিষ্ঠার পাশাপাশি বদলি ও পদায়ন বাণিজ্য বন্ধ করাও গুরুত্বপূর্ণ। এ ক্ষেত্রে সরকারি পদে পদায়নের জন্য লটারি পদ্ধতি চালু করার উদ্যোগ বিশেষভাবে তাৎপর্যপূর্ণ। কারণ, কোনো পদে নিয়োগ বা বদলির সিদ্ধান্ত যদি ব্যক্তিগত তদবির, রাজনৈতিক প্রভাব কিংবা আর্থিক লেনদেনের পরিবর্তে নির্ধারিত যোগ্যতার ভিত্তিতে স্বচ্ছ প্রক্রিয়ায় নেওয়া যায়, তাহলে দুর্নীতির একটি বড় পথ বন্ধ করা সম্ভব।
সম্প্রতি সাব-রেজিস্ট্রারদের বদলিতে লটারি পদ্ধতি চালু করার উদ্যোগ এ ক্ষেত্রে আলোচনার দাবি রাখে। আইন মন্ত্রণালয়ের উদ্যোগে বদলি প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা নিশ্চিত করার লক্ষ্যে এ পদ্ধতি অনুসরণ করা হয়েছে। দীর্ঘদিন ধরে সাব-রেজিস্ট্রার পদকে কেন্দ্র করে ঘুষ ও তদবির বাণিজ্যের অভিযোগ রয়েছে। ফলে এ পদে বদলির ক্ষেত্রে লটারি চালুর উদ্যোগ প্রশাসনিক সংস্কারের একটি গুরুত্বপূর্ণ দৃষ্টান্ত হতে পারে। তবে এ ব্যবস্থায় দুর্নীতি কতটা কমেছে, তা নিশ্চিতভাবে মূল্যায়নের জন্য নিয়মিত নজরদারি, অভিযোগের পরিসংখ্যান এবং সেবাগ্রহীতাদের অভিজ্ঞতা পর্যালোচনা করা প্রয়োজন।
অতীতে ভূমি নিবন্ধন খাতের কিছু পদকে ঘিরে বিপুল অর্থের লেনদেনের অভিযোগ বিভিন্ন সময়ে আলোচনায় এসেছে। বিশেষ করে গুলশান, গাজীপুর, রূপগঞ্জ ও কেরানীগঞ্জের মতো গুরুত্বপূর্ণ এলাকায় সাব-রেজিস্ট্রার হিসেবে পদায়নের জন্য কোটি কোটি টাকা ব্যয়ের অভিযোগ রয়েছে। এসব অভিযোগের সত্যতা যথাযথ তদন্তের মাধ্যমে নির্ধারণ করা জরুরি। তবে একটি বিষয় স্পষ্ট—কোনো সরকারি পদকে যদি আর্থিক সুবিধা অর্জনের মাধ্যম হিসেবে বিবেচনা করা হয়, তাহলে সেখানে অনিয়মের ঝুঁকি বেড়ে যায়। লটারি পদ্ধতি সেই ঝুঁকি কমানোর একটি উপায় হতে পারে, যদি প্রক্রিয়াটি স্বচ্ছ, নিরপেক্ষ ও কারসাজিমুক্ত থাকে।
কিন্তু সাব-রেজিস্ট্রারদের বদলিতে লটারি চালু করলেই সরকারি প্রশাসনের বদলি বাণিজ্য বন্ধ হয়ে যাবে না। কারণ, দেশের বিভিন্ন সরকারি দপ্তরে এখনো লাভজনক পদে পদায়ন ও পছন্দের কর্মস্থলে বদলিকে কেন্দ্র করে তদবিরের অভিযোগ রয়েছে। সরকারি ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক থেকে শুরু করে চিকিৎসক, পুলিশ কর্মকর্তা, প্রকৌশলী, প্রশাসনিক কর্মকর্তা এবং বিভিন্ন স্তরের কর্মচারীদের পদায়ন নিয়ে নানা সময়ে প্রশ্ন উঠেছে। কিছু পদ ও কর্মস্থলকে ঘিরে এমন ধারণাও তৈরি হয়েছে যে, সেখানে নিয়োগ বা বদলি পেতে হলে অর্থ ব্যয় কিংবা প্রভাবশালী ব্যক্তির সুপারিশ প্রয়োজন।
আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর ক্ষেত্রেও বদলি বাণিজ্যের অভিযোগ দীর্ঘদিনের। বিশেষ করে থানাকেন্দ্রিক প্রশাসনে ওসির পদায়ন নিয়ে বিভিন্ন সময়ে অর্থ লেনদেনের অভিযোগ প্রকাশিত হয়েছে। গুলশান, বনানী ও ধানমন্ডির মতো অভিজাত এলাকার থানায় ওসি পদে যেতে অতীতে বিপুল অঙ্কের অর্থ ব্যয়ের অভিযোগও রয়েছে। একইভাবে কিছু থানায় কনস্টেবলসহ বিভিন্ন পদে নিয়োগ ও পদায়ন নিয়ে আর্থিক লেনদেনের অভিযোগ শোনা যায়। এসব অভিযোগের নিরপেক্ষ তদন্ত ও দায়ীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণ জরুরি।
যে পুলিশ সদস্যকে একটি পদে বসতে ঘুষ দিতে হয়, তাঁর ওপর সততা বজায় রাখার চাপ তৈরি করা কঠিন হয়ে পড়ে। কারণ, পদ পাওয়ার জন্য ব্যয় করা অর্থ ফেরত আনার প্রবণতা তাঁকে অনৈতিক পথে ঠেলে দিতে পারে। এভাবে বদলি বাণিজ্য শুধু প্রশাসনিক অনিয়ম সৃষ্টি করে না, আইনশৃঙ্খলা রক্ষা ও জনগণের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার ক্ষেত্রেও নেতিবাচক প্রভাব ফেলে।
নিম্ন আদালতের বিচারকদের বদলি ও পদায়ন নিয়েও বিভিন্ন সময়ে অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে। অতীতের বিভিন্ন প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত এবং বিচারকদের বদলি ঘিরে আর্থিক লেনদেনের অভিযোগের নিরপেক্ষ তদন্ত হওয়া প্রয়োজন। বিশেষ করে ঢাকা ও আশপাশের এলাকায় পদায়নকে কেন্দ্র করে তদবিরের অভিযোগ সামনে এসেছে। বিচার বিভাগের মতো গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠানে পদায়ন প্রক্রিয়া নিয়ে প্রশ্ন উঠলে বিচারব্যবস্থার নিরপেক্ষতা ও প্রাতিষ্ঠানিক আস্থাও ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। তাই এখানে স্বচ্ছ নীতিমালা, নির্ধারিত যোগ্যতা এবং জবাবদিহি নিশ্চিত করা অত্যন্ত জরুরি।
অন্তর্বর্তী সরকারের সময়েও সচিব পর্যায়ে পদায়ন ও পদোন্নতি, জেলা প্রশাসক নিয়োগ এবং জনপ্রশাসনের বিভিন্ন সিদ্ধান্ত নিয়ে অনিয়মের অভিযোগ গণমাধ্যমে প্রকাশিত হয়েছে। ডিসি নিয়োগ নিয়ে বিতর্কের জেরে জনপ্রশাসন সচিবের বদলির ঘটনাও আলোচনায় আসে। একই সময়ে রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংক ও বিমা প্রতিষ্ঠানের শীর্ষ পদে নিয়োগ ঘিরে মধ্যস্বত্বভোগীদের তৎপরতা এবং আর্থিক লেনদেনের অভিযোগও সামনে এসেছে। এসব ক্ষেত্রে অভিযোগের সত্যতা যাচাই করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার পাশাপাশি ভবিষ্যতে যাতে একই ধরনের পরিস্থিতি তৈরি না হয়, সে জন্য প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার জরুরি।
বন বিভাগ, গণপূর্ত অধিদপ্তর, সড়ক ও জনপথ অধিদপ্তর এবং স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তরের মতো উন্নয়ন ও অবকাঠামোসংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানেও লাভজনক পদে পদায়ন নিয়ে বিভিন্ন সময়ে অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে। এসব দপ্তরে প্রকল্প, ক্রয়, ঠিকাদারি ও প্রশাসনিক সিদ্ধান্তের সঙ্গে পদায়নের সম্পর্ক তৈরি হলে দুর্নীতির ঝুঁকি আরও বাড়ে। কোনো কোনো উচ্চপদে পদায়নের জন্য বিপুল অর্থ লেনদেনের অভিযোগও রয়েছে। তবে এ ধরনের গুরুতর অভিযোগের ক্ষেত্রে নির্দিষ্ট তথ্য, তদন্ত ও প্রমাণের ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত নেওয়া উচিত।
চিকিৎসকদের বদলি ও পদায়নের ক্ষেত্রেও একই সমস্যা দেখা যায়। ঢাকাকেন্দ্রিক সুযোগ-সুবিধা, পেশাগত উন্নয়ন এবং ব্যক্তিগত নানা কারণে অনেক চিকিৎসক রাজধানী ও আশপাশের এলাকায় কর্মস্থল পেতে আগ্রহী থাকেন। এ সুযোগে বদলি নিয়ে তদবির ও অর্থ লেনদেনের অভিযোগ ওঠে। অতীতে বিপুলসংখ্যক চিকিৎসক ও স্বাস্থ্যকর্মীর বদলি নিয়ে বিতর্কও হয়েছে। কোনো কোনো ক্ষেত্রে বদলির পর নতুন কর্মস্থলে যোগদান না করার অভিযোগ সামনে এসেছে। এর পরিণতিতে জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে চিকিৎসকসংকট আরও প্রকট হয় এবং প্রত্যন্ত অঞ্চলের মানুষ প্রয়োজনীয় স্বাস্থ্যসেবা থেকে বঞ্চিত হন।
সরকারি চাকরির পদায়ন ও বদলিতে দুর্নীতি চলতে থাকলে এর ক্ষতি কেবল সংশ্লিষ্ট দপ্তরের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না। একটি অসাধু মধ্যস্বত্বভোগী গোষ্ঠী প্রশাসনের বিভিন্ন স্তরে প্রভাব বিস্তার করে। তারা রাজনৈতিক পরিচয় ও ক্ষমতার নৈকট্য ব্যবহার করে নিজেদের অবস্থান শক্তিশালী করে। অন্যদিকে, যোগ্য ও সৎ কর্মকর্তারা পছন্দের কর্মস্থল কিংবা পদোন্নতির সুযোগ থেকে বঞ্চিত হতে পারেন। প্রশাসনের প্রতি জনগণের আস্থা কমে যায় এবং সরকারি সেবার মান ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
এ অবস্থায় সাব-রেজিস্ট্রারদের বদলিতে লটারি পদ্ধতি চালুর উদ্যোগকে বৃহত্তর প্রশাসনিক সংস্কারের সূচনা হিসেবে বিবেচনা করা যেতে পারে। তবে এ পদ্ধতির সফলতা নির্ভর করবে এর বাস্তবায়ন কতটা স্বচ্ছ ও কার্যকর হচ্ছে তার ওপর। লটারিতে অংশগ্রহণের আগে যোগ্যতা, অভিজ্ঞতা, চাকরির মেয়াদ, শৃঙ্খলাজনিত রেকর্ড এবং সংশ্লিষ্ট পদের উপযোগিতা যাচাই করতে হবে। এরপর নির্ধারিত যোগ্যতাসম্পন্ন কর্মকর্তাদের মধ্যে স্বচ্ছ ও নিরীক্ষাযোগ্য প্রক্রিয়ায় পদায়ন করা যেতে পারে। একই সঙ্গে বিশেষ পরিস্থিতিতে লটারির বাইরে পদায়নের প্রয়োজন হলে তার কারণ লিখিতভাবে প্রকাশ এবং স্বাধীনভাবে যাচাইয়ের ব্যবস্থা থাকা উচিত।
ইতোমধ্যে গণপূর্ত অধিদপ্তরের নির্বাহী প্রকৌশলীদের বদলি ও পদায়নে লটারি পদ্ধতি অনুসরণের উদ্যোগের কথা জানানো হয়েছে। বদলি বাণিজ্য বন্ধ, স্বচ্ছতা প্রতিষ্ঠা এবং জবাবদিহি নিশ্চিত করার লক্ষ্যে এ ধরনের উদ্যোগ অন্যান্য দপ্তরেও সম্প্রসারণ করা যেতে পারে। তবে শুধু লটারি চালু করলেই সব সমস্যার সমাধান হবে না। পদায়নের পর কর্মকর্তাদের কাজের মূল্যায়ন, অনিয়মের অভিযোগ তদন্ত, সম্পদের হিসাব যাচাই এবং সেবার মান পর্যবেক্ষণের ব্যবস্থাও জোরদার করতে হবে।
রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংক ও বিমা প্রতিষ্ঠানের ব্যবস্থাপনা পরিচালকসহ শীর্ষ নির্বাহী পদে নিয়োগের ক্ষেত্রেও স্বচ্ছ পদ্ধতি গ্রহণ করা সম্ভব। প্রথমে অভিজ্ঞতা, পেশাগত দক্ষতা, সততা ও কর্মদক্ষতার ভিত্তিতে যোগ্য প্রার্থীদের একটি তালিকা তৈরি করা যেতে পারে। এরপর যেসব পদে যোগ্য প্রার্থীদের মধ্যে সমান সুযোগ দেওয়া যুক্তিসংগত, সেখানে লটারি পদ্ধতি বিবেচনা করা যেতে পারে। তবে বিশেষায়িত ও নীতিনির্ধারণী পদে শুধু লটারির ওপর নির্ভর না করে যোগ্যতা যাচাই, নিরপেক্ষ বাছাই এবং প্রাতিষ্ঠানিক প্রয়োজনকে অগ্রাধিকার দিতে হবে।
জেলা প্রশাসক নিয়োগের ক্ষেত্রেও একটি স্বচ্ছ ও গ্রহণযোগ্য কাঠামো গড়ে তোলা সম্ভব। নির্ধারিত যোগ্যতা, অভিজ্ঞতা ও কর্মদক্ষতার ভিত্তিতে উপযুক্ত কর্মকর্তাদের তালিকা তৈরি করে পদায়নের সিদ্ধান্ত নেওয়া যেতে পারে। একইভাবে থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা, চিকিৎসক, প্রকৌশলী এবং অন্যান্য সরকারি কর্মচারীদের বদলির ক্ষেত্রে স্পষ্ট নীতিমালা অনুসরণ করা জরুরি। যেখানে একাধিক সমযোগ্য কর্মকর্তার মধ্যে কর্মস্থল বণ্টন করা প্রয়োজন, সেখানে লটারি কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারে। তবে কোনো পদ্ধতিই যেন পেশাগত যোগ্যতা, বিশেষায়িত দক্ষতা ও জনস্বার্থের প্রয়োজনকে উপেক্ষা না করে।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, বদলি ও পদায়নকে আর্থিক সুবিধা অর্জনের সুযোগ হিসেবে দেখার সংস্কৃতি বন্ধ করা। একজন কর্মকর্তা যদি কোনো পদে নিয়োগ বা বদলি পেতে ঘুষ দিতে বাধ্য না হন, তাহলে তাঁর ওপর সেই অর্থ তুলে আনার চাপও কমবে। এতে সততার সঙ্গে দায়িত্ব পালনের পরিবেশ তৈরি হতে পারে। পাশাপাশি সরকারি কর্মচারীদের জবাবদিহি নিশ্চিত করা গেলে জনগণের আস্থা অর্জন এবং সেবার মান উন্নয়নের সুযোগ বাড়বে।
দুর্নীতির বিরুদ্ধে কার্যকর লড়াই করতে হলে কেবল দুর্নীতির অভিযোগে ব্যক্তিবিশেষের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিলেই চলবে না; দুর্নীতি সৃষ্টির প্রাতিষ্ঠানিক পথগুলোও বন্ধ করতে হবে। নিয়োগ, বদলি ও পদায়ন বাণিজ্য এমনই একটি পথ, যা প্রশাসনের ভেতরে দুর্নীতির শিকড় বিস্তারে ভূমিকা রাখে। তাই এ ক্ষেত্রে স্বচ্ছতা প্রতিষ্ঠা করা বর্তমান সরকারের জন্য গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষাও বটে।
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সরকারের দুর্নীতিবিরোধী উদ্যোগ সফল করতে হলে সাব-রেজিস্ট্রারদের বদলিতে চালু হওয়া লটারি পদ্ধতির অভিজ্ঞতা মূল্যায়ন করে অন্যান্য উপযুক্ত সরকারি দপ্তরে তা পর্যায়ক্রমে সম্প্রসারণ করা যেতে পারে। একই সঙ্গে মধ্যস্বত্বভোগীদের তৎপরতা বন্ধ, বদলি ও পদায়নের নীতিমালা প্রকাশ, অভিযোগ তদন্ত এবং দায়ীদের শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে।
সরকারি চাকরিতে পদ পাওয়ার যোগ্যতা হবে দক্ষতা, অভিজ্ঞতা ও সততা—অর্থ কিংবা রাজনৈতিক তদবির নয়। এই নীতি প্রতিষ্ঠা করা গেলে প্রশাসনে দুর্নীতি কমানোর পাশাপাশি জনগণের সেবা নিশ্চিত করার পথও সুগম হবে। বদলি ও পদায়নে লটারি তাই সবার জন্য একক সমাধান না হলেও, যথাযথ যোগ্যতা যাচাই ও জবাবদিহির সঙ্গে বাস্তবায়িত হলে এটি দুর্নীতিবিরোধী সংস্কারের একটি কার্যকর হাতিয়ার হয়ে উঠতে পারে।